ক্যান্সার হলে কতদিন বাঁচে? – একটি আশাবাদী দৃষ্টিকোণ

Pathology Knowledge
0

ক্যান্সার হলে কতদিন বাঁচে? – একটি আশাবাদী দৃষ্টিকোণ


ক্যান্সার শব্দটা শুনলেই অনেকের মনে ভয়ের ছায়া পড়ে যায়। "ক্যান্সারের রোগী কতদিন বাঁচে?" – এই প্রশ্নটা তো প্রায় প্রত্যেক রোগীর আত্মীয়-স্বজনের মুখে শোনা যায়। আমি একজন প্যাথলজিস্ট হিসেবে দিনের পর দিন এমন প্রশ্নের মুখোমুখি হই। কখনো রিপোর্ট দেখিয়ে বলেন, "ডাক্তার, এখন কী হবে? কতদিন সময় আছে?" যেন ক্যান্সারটা একটা টাইমার লাগানো বোমা! কিন্তু সত্যি বলতে, এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়া যতটা সহজ মনে হয়, ততটা নয়। আজকে চলুন, এই বিষয়টা নিয়ে একটু হালকা মেজাজে কথা বলি – কারণ ক্যান্সার ভয়ের জিনিস হলেও, আধুনিক চিকিত্সায় অনেক ক্ষেত্রে এটা জয় করা যায়। আর হ্যাঁ, গ্রামের আড্ডায় শোনা সেই "ডাক্তার বলল ২৮ দিন, কিন্তু ৫ বছর বেঁচে আছে" গল্পগুলো? সেগুলো শুনতে মজা লাগে, কিন্তু বিজ্ঞানের চোখে দেখলে সেটা একটা অসম্পূর্ণ ছবি।


ক্যান্সার হলে কতদিন বাঁচে? – একটি আশাবাদী দৃষ্টিকোণ


ক্যান্সার আসলে কী? একটা 'পরগাছা'র গল্প


কল্পনা করুন, আপনার শরীরটা একটা বাগান। সেখানে সুন্দর সুন্দর ফুল-ফল গাছ আছে, যা নিয়ম মেনে বাড়ছে। হঠাৎ একটা গাছ পাল্টে যায় – সেটা আর নিয়ম মানে না, অসীমিতভাবে বাড়তে থাকে এবং অন্য গাছের খাবার চুরি করে। এটাই ক্যান্সার! সাধারণ কোষ থেকে ক্যান্সার কোষে রূপান্তর হয় কোনো কারণে – ধূমপান, দূষণ, জেনেটিক্স বা এমনকি ভাগ্যএরপর সেটা দ্বিগুণ, চতুর্গুণ হয়ে টিউমার তৈরি করে। মজার ব্যাপার, ক্যান্সার কোষগুলো শরীরের 'ভিলেন' – তারা রক্তপাত ঘটায়, পুষ্টি চুরি করে রোগীকে দুর্বল করে, এমনকি অন্য অঙ্গে ছড়িয়ে পড়ে (যাকে বলে মেটাস্টেসিস)। ফলে রোগী ক্ষুধাহীন হয়, ওজন কমে, এবং শেষ পর্যন্ত জটিলতায় মৃত্যু হতে পারে। কিন্তু সব ক্যান্সার সমান নয় – কিছু ধীরগতির 'স্লোয়ার', কিছু দ্রুত 'ফাস্ট ফরোয়ার্ড'।


প্যাথলজিক্যালি বলতে গেলে, ক্যান্সার মূলত দুই ধরনের: কার্সিনোমা (যা শরীরের আবরণী কোষ থেকে হয়) এবং সার্কোমা (যা হাড়-মাংসপেশী থেকে)। কার্সিনোমা যদি প্রথম দিকে ধরা পড়ে এবং আবরণে সীমাবদ্ধ থাকে (ইন সিটু), তাহলে অপারেশন করে ফেলে দিলেই শেষ। কিন্তু যদি ছড়িয়ে পড়ে, তাহলে গল্পটা জটিল হয়ে যায়। সার্কোমা? সেটা তো আরও দ্রুত – চিকিত্সা না করলে রোগীদের 'স্প্রিন্ট' করে চলে যাওয়ার মতো।


স্টেজ আর গ্রেড: ক্যান্সারের 'লেভেল' গেম


ক্যান্সার হলে কতদিন বাঁচে, সেটা নির্ভর করে স্টেজ আর গ্রেডের ওপর। স্টেজ মানে কতটা ছড়িয়েছে – ১ থেকে ৪। স্টেজ ১? ছোটখাটো, সহজে জিতে যাওয়া যায়। স্টেজ ৪? ছড়িয়ে পড়েছে সর্বত্র, যেন একটা পার্টিতে সবাইকে আমন্ত্রণ করেছে! গ্রেডটা হলো কোষের 'চেহারা' – ১ মানে সাধারণ কোষের মতো (ধীরগতি), ৪ মানে অচেনা দানব (দ্রুত ছড়ায়)। মাইক্রোস্কোপে দেখে আমরা প্যাথলজিস্টরা এটা নির্ধারণ করি। হাসির কথা, কখনো রোগীরা বলেন, "ডাক্তার, গ্রেড ২? তাহলে আমি পাস?" – কিন্তু না, এটা গেম নয়, তবে সঠিক সময়ে ধরলে জিতে যাওয়া যায়।


চিকিত্সা: যুদ্ধের অস্ত্রশস্ত্র


ক্যান্সারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের অস্ত্র? সার্জারি, কেমোথেরাপি এবং রেডিয়োথেরাপি। সার্জারি মানে ক্যান্সারের অংশটা কেটে ফেলে দেওয়া – যেন বাগান থেকে আগাছা তুলে ফেলা। কেমো? ওষুধ দিয়ে কোষ মারা, কিন্তু সাইড ইফেক্ট হিসেবে চুল পড়া বা দুর্বলতা আসতে পারে। রেডিয়ো? কিছু ক্যান্সার এতে সহজে মরে যায়, যেন সূর্যের আলোয় ভ্যাম্পায়ার! মজার ব্যাপার, আমার এক শিক্ষকের স্ত্রীর স্তন ক্যান্সার ২৫ বছর আগে ধরা পড়ে – চিকিত্সা নিয়ে এখনো সুস্থ। আরেক আত্মীয়ের জরায়ু ক্যান্সার ছড়িয়ে পড়েছিল, কিন্তু রেডিয়ো-কেমোতে ১৮ বছর ধরে ভালো আছেন। কিন্তু যারা চিকিত্সা পাল্টাতে থাকেন – আজ অ্যালোপ্যাথি, কাল হোমিও – তারা প্রায়শই হেরে যান। চিকিত্সকের দক্ষতা, ওষুধের গুণমান – সবকিছু মিলে ফলাফল নির্ধারিত হয়।


আরেকটা মজার গল্প: এক রোগীর স্বামী ভেবেছিলেন বউয়ের স্তন ক্যান্সারে আর বাঁচার সময় নেই, তাই অন্য বিয়ে ঠিক করেছেন! ডাক্তার বললেন, "আপনার স্ত্রী তো সম্পূর্ণ সুস্থ!" লোকটা হতভম্ব – "এখন কী করি?" এমন ঘটনা দেখলে বোঝা যায়, ক্যান্সার সবসময় শেষ নয়।


কতদিন বাঁচবে? আল্লাহ জানেন, কিন্তু বিজ্ঞান বলে...


সত্যি কথা, কোনো ডাক্তার সঠিকভাবে বলতে পারেন না "ক্যান্সার হলে কতদিন বাঁচে"। এটা নির্ভর করে ক্যান্সারের ধরন, স্থান, স্টেজ, গ্রেড, চিকিত্সা এবং রোগীর শারীরিক অবস্থার ওপর। কিছু রোগী মাস কয়েকে চলে যান, কিছু দশক ধরে বাঁচেন। আমার দেখা একজন গলার ক্যান্সারে ১৫ বছর বেঁচে হার্ট অ্যাটাকে মারা গেছেন। আরেকজন একই ধরনের ক্যান্সারে অল্পদিনে গেলেন, কারণ চিকিত্সা ঠিকমতো নেননি। মূল কথা: প্রথম দিকে ধরা পড়লে এবং সঠিক চিকিত্সা নিলে অনেকে সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে ওঠেন। ভয় পেয়ে চিকিত্সা ছেড়ে দেবেন না – সেটাই সবচেয়ে বড় ভুল।


শেষ কথা, ক্যান্সার একটা যুদ্ধ, কিন্তু জয়ী হওয়ার সম্ভাবনা অনেক। যদি আপনি বা আপনার কাছের কেউ এই সমস্যায় পড়েন, তাহলে বিশেষজ্ঞের সাথে কথা বলুন। আর গ্রামের গল্প শুনে মজা নিন, কিন্তু বিজ্ঞানে বিশ্বাস রাখুন। সুস্থ থাকুন, সচেতন থাকুন!

Tags:

Post a Comment

0Comments

Post a Comment (0)