প্রোল্যাকটিন হরমোন বেড়ে যাওয়ার লক্ষণ, কারণ, চিকিৎসা ও জটিলতা – সহজে বুঝে নিন!

Pathology Knowledge
0
ধরুন আপনার শরীরের হরমোন টিমে একজন সুপারভাইজার হঠাৎ ওভারটাইম শুরু করেছে। তার নাম প্রোল্যাকটিন। ফল? শরীর ভাবছে “এখনই দুধের ফ্যাক্টরি চালু!” কিন্তু আপনি তো গর্ভবতীও নন, নতুন মা-ও নন। এটাই হাইপারপ্রোল্যাক্টিনেমিয়া – পিটুইটারি গ্রন্থির সবচেয়ে মজার (আর একটু বিরক্তিকর) হরমোন ব্যাধি। 

প্রোল্যাকটিন হরমোন বেড়ে যাওয়ার লক্ষণ, কারণ, চিকিৎসা ও জটিলতা – সহজে বুঝে নিন!


সুসংবাদটা হলো, এটা ধরা পড়লে এবং ঠিকঠাক সামলালে বেশিরভাগ মানুষ পুরোপুরি সুস্থ জীবন ফিরে পান। আজ আমরা হাসি-মজা করে, একদম সহজ ভাষায় জেনে নেব প্রোল্যাকটিন হরমোন বেড়ে যাওয়ার লক্ষণ, কারণ, জটিলতা আর চিকিৎসার গল্প। চলুন শুরু করি!


প্রোল্যাকটিন হরমোন আসলে কী করে?


প্রোল্যাকটিন হলো পিটুইটারি গ্রন্থির তৈরি একটা “মাল্টিটাস্কিং হিরো”। এর কাজের লিস্ট দেখলে অবাক হবেন:


- স্তন্যদান শুরু ও চালিয়ে যাওয়া

- স্তনের টিস্যু তৈরি করা

- গর্ভাবস্থায় ভ্রূণকে জরায়ুতে আটকে রাখতে সাহায্য করা

- ইমিউন সিস্টেমকে একটু শান্ত রাখা

- এমনকি রক্তনালী তৈরিতেও হাত লাগানো!


সাধারণত ডোপামিন নামের আরেক হরমোন এসে বলে, “ভাই, চুপচাপ থাকো!” আর ইস্ট্রোজেন মাঝে মাঝে উস্কানি দেয়। কিন্তু যখন ডোপামিনের ব্রেক কাজ করে না, তখনই শুরু হয় হাইপারপ্রোল্যাক্টিনেমিয়ার নাটক।


হাইপারপ্রোল্যাক্টিনেমিয়ার লক্ষণ – শরীর কীভাবে সিগন্যাল দেয়?


প্রোল্যাকটিন হরমোন বেড়ে যাওয়ার লক্ষণ ছেলে-মেয়ে দুইজনের ক্ষেত্রে আলাদা আলাদা স্টাইলে আসে।


মহিলাদের ক্ষেত্রে (সবচেয়ে বেশি দেখা যায়):

- মাসিক অনিয়মিত বা একদম বন্ধ (অ্যামেনোরিয়া)

- বুক থেকে দুধের মতো স্রাব (গ্যালাক্টোরিয়া) – যেন শরীর বলছে “আমি রেডি!”

- যোনিপথ শুষ্কতা, অন্তরঙ্গ মুহূর্তে অস্বস্তি

- বন্ধ্যাত্ব বা কনসিভ করতে সমস্যা


পুরুষদের ক্ষেত্রে (এটা আরও মজার কিন্তু বিরক্তিকর):

- ইরেক্টাইল ডিসফাংশন – “আজকে মুড নেই ভাই!”

- টেস্টোস্টেরন কমে যাওয়া

- স্তনের টিস্যু বেড়ে যাওয়া (গাইনোকোমাস্টিয়া) – শার্টের বোতাম টাইট হয়ে যাওয়া!

- লিবিডো একদম কমে যাওয়া


দুইজনের কমন লক্ষণ: হাড় দুর্বল হয়ে যাওয়া, যৌন ইচ্ছা কমে যাওয়া।


কেন হয় এই সমস্যা? কারণগুলো জানলে অবাক হবেন

চিকিৎসকরা কারণগুলোকে তিনটা বড় বাক্সে ভাগ করেন:


1. শারীরিক কারণ  

   - প্রোল্যাক্টিনোমা (পিটুইটারিতে সৌম্য টিউমার – সবচেয়ে কমন)  

   - থাইরয়েড কম কাজ করা  

   - দীর্ঘদিনের কিডনি সমস্যা  

   - PCOS  

   - বুকের দেয়ালে আঘাত বা অপারেশন


2.ওষুধের কারণ (এটাই সবচেয়ে বেশি শোনা যায়!)  

   অ্যান্টিসাইকোটিক, বমি বন্ধের ওষুধ, জন্মনিয়ন্ত্রণ পিল, উচ্চ রক্তচাপের কিছু ওষুধ, অম্বলের ওষুধ – এরা ডোপামিনকে ব্লক করে প্রোল্যাকটিনকে ছেড়ে দেয়।


3. মানসিক-শারীরিক কারণ

   প্রচণ্ড স্ট্রেস, অতিরিক্ত ব্যায়াম, টাইট ব্রা, গর্ভাবস্থা (স্বাভাবিকভাবেই বাড়ে)।


জটিলতা – ছোট করে নিলে বড় সমস্যা!


অনেকদিন ধরে উচ্চ প্রোল্যাকটিন থাকলে:

- বন্ধ্যাত্ব (দুই লিঙ্গেই)

- অস্টিওপরোসিস (হাড় ভঙ্গুর)

- পুরুষদের টেস্টোস্টেরন কমে পুরুষত্ব হারানোর অনুভূতি

- বড় টিউমার হলে মাথাব্যথা, দৃষ্টি ঝাপসা, এমনকি পিটুইটারি অ্যাপোপ্লেক্সি (জরুরি অবস্থা)


তাই সময়মতো ধরা পড়লে অনেক কিছু এড়ানো যায়।


কীভাবে ধরা পড়ে? রোগ নির্ণয় সহজ!


প্রথমে সকালের রক্ত পরীক্ষা। তারপর:

- থাইরয়েড ও কিডনি চেক

- গর্ভাবস্থা টেস্ট (মেয়েদের ক্ষেত্রে)

- দরকার হলে মাথার MRI (পিটুইটারি দেখতে)


চিকিৎসা – আধুনিক বিজ্ঞানের জাদু!


বেশিরভাগ ক্ষেত্রে শুধু ওষুধেই সব ঠিক হয়ে যায়:

- ডোপামিন অ্যাগোনিস্ট (ক্যাবার্গোলিন বা ব্রোমোক্রিপটিন) – প্রোল্যাকটিনকে বলে “চুপ করো!”

- যদি ওষুধে না কমে তাহলে অস্ত্রোপচার বা খুব কম ক্ষেত্রে রেডিয়েশন

- হরমোন রিপ্লেসমেন্ট (ইস্ট্রোজেন/টেস্টোস্টেরন)


আর যদি কোনো ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হয়, ডাক্তার সেই ওষুধ বদলে দেন।


কখন ডাক্তারের কাছে ছুটবেন?


- হঠাৎ মাথাব্যথা + দৃষ্টি ঝাপসা

- বুক থেকে দুধ পড়ছে (গর্ভাবস্থা ছাড়া)

- মাসিক একদম বন্ধ বা অনিয়মিত

- দীর্ঘদিন ধরে কনসিভ করতে না পারলে


আরো পড়ুন: মহিলাদের প্রোল্যাকটিন হরমোন বেড়ে গেলে কি হয়


প্রতিরোধে ছোট ছোট টিপস (যা আপনি আজ থেকেই শুরু করতে পারেন)


- স্ট্রেস কমান (ধ্যান, ঘুম, হাসি)

- ভিটামিন B6, জিঙ্ক, ম্যাগনেসিয়াম সমৃদ্ধ খাবার খান

- অতিরিক্ত ব্যায়াম নয়, মডারেট

- টাইট ব্রা এড়ান

- অ্যালকোহল-ক্যাফেইন কমান

- পরিবারে কারো থাকলে জেনেটিক কাউন্সেলিং নিন


শেষ কথা


হাইপারপ্রোল্যাক্টিনেমিয়া কোনো ভয়ের ব্যাপার নয়, বরং একটা সিগন্যাল যে শরীর বলছে “একটু যত্ন নাও ভাই!” সঠিক ডাক্তার, সঠিক ওষুধ আর সুস্থ জীবনযাপন – এই তিনটে মিলিয়ে আপনি আবার পুরোপুরি স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসবেন। 


প্রোল্যাকটিন হরমোন বেড়ে যাওয়ার লক্ষণ চিনে নিন, সময়মতো চেক করান। কারণ সুস্থ শরীরেই তো সুন্দর জীবন!


প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন


প্রশ্ন: হাইপারপ্রোল্যাক্টিনেমিয়া কতটা কমন?  

উত্তর: সাধারণ মানুষের মধ্যে খুব কম (১% এর নিচে), কিন্তু যাদের প্রজনন সমস্যা আছে তাদের মধ্যে ৫-১৪% ক্ষেত্রে দেখা যায়।


প্রশ্ন: উচ্চ প্রোল্যাকটিন কি খুব বিপজ্জনক?  

উত্তর: চিকিৎসা না করলে হ্যাঁ, কিন্তু চিকিৎসা করলে একদম নিরাপদ।


প্রশ্ন: কোন খাবার প্রোল্যাকটিন কমায়?  

উত্তর: কোনো “ম্যাজিক” খাবার নেই, তবে ভিটামিন B6 ও E যুক্ত খাবার (কলা, আলু, বাদাম, সবুজ শাক) সাহায্য করে।


আপনার কোনো লক্ষণ মিলছে? কমেন্টে বলুন, আমরা আরও বিস্তারিত আলোচনা করব। সুস্থ থাকুন, হাসতে থাকুন! 

Tags:

Post a Comment

0Comments

Post a Comment (0)