গর্ভাবস্থায় প্রস্রাবে ইনফেকশন হলে বাচ্চার কি কোন ক্ষতি হয়

Pathology Knowledge
0

গর্ভাবস্থা মানে শুধু পেটে একটা ছোট্ট অতিথির আগমন নয়, সেই সাথে শরীরের নানা অদ্ভুত পরিবর্তনও। আর সেই পরিবর্তনগুলোর মধ্যে একটা বিরক্তিকর “অনাহূত অতিথি” হলো মূত্রনালীর সংক্রমণ বা UTI। অনেক মা-ই এটা নিয়ে চিন্তায় পড়েন। কিন্তু চিন্তা করবেন না! আজ আমরা হাসি-ঠাট্টার ছলে, একদম সহজ ভাষায় পুরো ব্যাপারটা খুলে বলব। যাতে আপনি জেনে নিতে পারেন কীভাবে এই বিরক্তিকর সংক্রমণকে দূরে রাখবেন এবং যদি হয়েই যায়, তাহলে বাচ্চার কোনো ক্ষতি না হয়।

গর্ভাবস্থায় প্রস্রাবে ইনফেকশন হলে বাচ্চার কি কোন ক্ষতি হয়


ইউরিনারি ট্র্যাক্ট ইনফেকশন (UTI) আসলে কী?


কল্পনা করুন, আপনার মূত্রতন্ত্রটা একটা সুন্দর পাইপলাইন। এখানে ব্যাকটেরিয়া ঢুকে পড়লে পুরো সিস্টেমটা “জ্যাম” হয়ে যায়। সাধারণত মূত্রাশয়ে (সিস্টাইটিস), মূত্রনালীতে কিংবা কখনো কিডনিতে (পাইলোনেফ্রাইটিস) এই জীবাণু হুল্লোড় বাঁধায়। গর্ভাবস্থায় হরমোন আর বড় হওয়া জরায়ুর চাপে এই পাইপলাইনটা আরও সহজে আক্রান্ত হয়। সবচেয়ে বেশি দোষী? ই. কোলাই ব্যাকটেরিয়া – যেন প্রতিবেশীর বাড়ির অত্যাচারী কুকুরটা!


আরও পড়ুন:প্রস্রাবের ইনফেকশন দূর করবে যেসব খাবার: শীতকালীন অস্বস্তি থেকে মুক্তির সহজ উপায়


গর্ভাবস্থায় UTI কেন এত ঘন ঘন হয়?


ষষ্ঠ সপ্তাহ থেকে চব্বিশ সপ্তাহ পর্যন্ত এই সময়টা সবচেয়ে “ঝুঁকিপূর্ণ”। কারণ? 

- হরমোন প্রস্রাবের ফ্লো কমিয়ে দেয়, যেন ট্রাফিক জ্যাম!

- বড় হওয়া জরায়ু মূত্রাশয়ের উপর চাপ দেয়, প্রস্রাব পুরোপুরি বের হয় না।

- প্রস্রাবের অ্যাসিড কমে যায়, ব্যাকটেরিয়ার জন্য পার্টির আয়োজন হয়ে যায়।


ফলে ব্যাকটেরিয়া বংশবৃদ্ধি করে আর মা হয়ে পড়েন অস্বস্তিতে।


গর্ভাবস্থায় প্রস্রাবে ইনফেকশন হলে বাচ্চার কি কোন ক্ষতি হয়?


এটাই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন যেটা অনেক মায়ের মনে ঘুরপাক খায়। সত্যি বলতে, অবহেলা করলে ঝুঁকি আছে। কিন্তু সঠিক সময়ে চিকিৎসা নিলে ভয়ের কিছু নেই। সম্ভাব্য ক্ষতিগুলো হলো:


আরও পড়ুন:গর্ভাবস্থায় ইউরিন ইনফেকশনের লক্ষণ


- সময়ের আগে প্রসব (Preterm Birth): বাচ্চা নির্ধারিত তারিখের আগেই এসে পড়তে পারে।

- কম ওজনের শিশু: গর্ভে বেড়ে ওঠার গতি কমে যেতে পারে।

- বাচ্চার সংক্রমণ: প্রসবের সময় ব্যাকটেরিয়া বাচ্চার চোখ-নাক-মুখে ঢুকে ছোটখাটো ইনফেকশন ঘটাতে পারে।

- গুরুতর ক্ষেত্রে গর্ভপাত বা অন্য জটিলতা: খুবই বিরল, কিন্তু চিকিৎসা না নিলে সম্ভব।


মায়ের জন্যও কিডনিতে ছড়িয়ে পড়লে জ্বর, বমি, এমনকি সেপসিসের মতো অবস্থা হতে পারে। তাই লক্ষণ দেখলেই ডাক্তারের কাছে ছুটুন – নিজে নিজে অ্যান্টিবায়োটিক খাবেন না। গর্ভাবস্থায় সব ওষুধ নিরাপদ নয়!


আরও পড়ুন:প্রস্রাবে ইনফেকশন হলে কোন ডাক্তার দেখাবো


লক্ষণগুলো চিনে রাখুন (যাতে সময়মতো ধরা পড়ে)


গর্ভাবস্থায় ঘন ঘন প্রস্রাব তো স্বাভাবিক, কিন্তু এগুলো দেখলে সতর্ক হোন:

- প্রস্রাবের সময় জ্বালাপোড়া (যেন আগুন জ্বলছে!)

- তলপেটে ব্যথা বা চাপ অনুভব

- মেঘলা, দুর্গন্ধযুক্ত বা রক্তের আভা যুক্ত প্রস্রাব

- অল্প জ্বর বা কাঁপুনি

- পিঠের নিচে ব্যথা (কিডনির দিকে ছড়ালে বিপদ!)


কিডনি সংক্রমণ হলে জ্বর, বমি, ঠান্ডা লাগা – এগুলো দেখলেই হাসপাতালে ছুটবেন।


রোগ নির্ণয় কীভাবে হয়?


সাধারণ প্রস্রাবের পরীক্ষাই যথেষ্ট। গর্ভাবস্থার প্রথম চেকআপ থেকেই ডাক্তার নিয়মিত প্রস্রাব টেস্ট করান। যদি ইতিহাস থাকে বা লক্ষণ দেখা যায়, তাহলে আবার টেস্ট। কখনো কিডনির আল্ট্রাসাউন্ডও লাগতে পারে।


প্রতিরোধের মজার-সহজ উপায় (যা আপনি প্রতিদিন করতে পারবেন)


UTI-কে আটকাতে কোনো জাদু লাগে না, শুধু কয়েকটা স্মার্ট অভ্যাস:


- প্রচুর পানি খান: দিনে ৮-১০ গ্লাস। প্রস্রাব যত ঘন ঘন, ব্যাকটেরিয়া তত কম সময় পাবে বাসা বাঁধতে।

- সামনে থেকে পিছনে মুছুন: মলত্যাগের পর এই নিয়ম মেনে চললে “অনাহূত অতিথি” ঢুকতে পারবে না।

- সহবাসের আগে-পরে প্রস্রাব করুন: এক গ্লাস পানি খেয়ে টয়লেটে যান – ব্যাকটেরিয়া ধুয়ে যাবে।

- ক্র্যানবেরি জুস: গবেষণায় দেখা গেছে এতে থাকা যৌগ ব্যাকটেরিয়াকে আটকে দিতে সাহায্য করে (তবে ডাক্তারকে জিজ্ঞাসা করে খান)।

- ঢিলা-সুতির অন্তর্বাস পরুন: টাইট জিন্স আর সিন্থেটিক কাপড় বাদ দিন। ঘাম হলে ব্যাকটেরিয়ার পার্টি!

- ডিওডোরেন্ট স্প্রে-ডাচ এড়িয়ে চলুন: এগুলো যোনিপথের ভারসাম্য নষ্ট করে।

- ভিটামিন সি সমৃদ্ধ খাবার: লেবু, কমলা, পালং শাক – প্রস্রাবকে একটু অ্যাসিডিক রাখে।


উপসংহার

গর্ভাবস্থায় মূত্রনালীর সংক্রমণ একদম সাধারণ, কিন্তু অবহেলা করলে মা-বাচ্চা দুজনেরই ঝামেলা। তাই নিয়মিত প্রসবপূর্ব চেকআপ করান, লক্ষণ দেখলেই ডাক্তারের কাছে যান এবং উপরের প্রতিরোধের টিপসগুলো মেনে চলুন। সুস্থ-স্বাভাবিক গর্ভাবস্থা কাটুক, বাচ্চা আসুক হাসি-খুশিতে!


আপনার কি প্রস্রাবের সময় জ্বালাপোড়া, তলপেটে ব্যথা বা অন্য কোনো লক্ষণ অনুভব হচ্ছে? নীচে কমেন্ট করুন কিংবা সরাসরি আপনার গাইনোকলজিস্টের সাথে কথা বলুন। সুস্থ থাকুন, সুন্দর গর্ভাবস্থা কাটুক! 

Tags:

Post a Comment

0Comments

Post a Comment (0)