পিটুইটারি টিউমারের লক্ষণ

Pathology Knowledge
0

মস্তিষ্কের ঠিক নিচে, নাকের পেছনে একটা ছোট্ট মটরদানার মতো গ্রন্থি আছে—"পিটুইটারি গ্রন্থি"। এটাকে বলা হয় শরীরের “মাস্টার গ্রন্থি”, কারণ এটি অন্যান্য অনেক হরমোন নিয়ন্ত্রণ করে। কিন্তু যখন এখানে টিউমার হয় (বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সৌম্য, অর্থাৎ ক্যান্সার নয়), তখন সে আর মাস্টার থাকে না—বিদ্রোহী হয়ে ওঠে। 

পিটুইটারি টিউমারের লক্ষণ: শরীরের ‘মাস্টার গ্রন্থি’ যখন বিদ্রোহ করে


টিউমারটা হয় ছোট (মাইক্রোঅ্যাডেনোমা) নয়তো বড় (ম্যাক্রোঅ্যাডেনোমা)। ছোটগুলো প্রায়ই চুপচাপ থাকে, কিন্তু বড় হলে বা হরমোন বেশি/কম উৎপাদন করলে লক্ষণগুলো মাথা তুলে দাঁড়ায়।


পিটুইটারি টিউমারের সাধারণ লক্ষণ (ম্যাস ইফেক্টের কারণে)


টিউমার বড় হলে চারপাশের টিস্যুতে চাপ দেয়। ফলে দেখা দেয়:


- মাথাব্যথা: সবচেয়ে কমন লক্ষণ। অনেক সময় মাইগ্রেনের মতো মনে হয়, কিন্তু ওষুধে কমে না।

- দৃষ্টির সমস্যা: সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা। 

  - পাশের দৃষ্টি (পেরিফেরাল ভিশন) হারিয়ে যাওয়া — “টানেল ভিশন” এর মতো।

  - ঝাপসা দেখা, দ্বিগুণ দেখা (ডবল ভিশন)।

  - চোখ নড়াতে অসুবিধা বা চোখের পাতা ঝুলে যাওয়া।

- মুখের অসাড়তা বা ব্যথা।

- ক্লান্তি, দুর্বলতা।

- বমি বমি ভাব

- মেজাজের উঠানামা, অনিয়মিত মাসিক, দুধ আসা (মহিলাদের ক্ষেত্রে)


পিটুইটারি টিউমার কী?


এটা মূলত শরীরের হরমোন নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রের একটা ছোট্ট ‘বিদ্রোহ’। বেশিরভাগ সময় এটা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণযোগ্য। তাই যদি মাথাব্যথা, দৃষ্টি ঝাপসা বা হরমোনজনিত অদ্ভুত সমস্যা অনুভব করেন, তাহলে অবহেলা করবেন না। একজন অভিজ্ঞ এন্ডোক্রাইনোলজিস্ট বা নিউরোসার্জনের সাথে কথা বলুন।


পিটুইটারি টিউমারের প্রকারভেদ: কে কী করছে?


১. নন-ফাংশনাল টিউমার (অকার্যকর)

এরা চুপচাপ থাকে, কোনো অতিরিক্ত হরমোন বানায় না। কিন্তু যখন বড় হয়, তখন আশেপাশের স্নায়ুতে চাপ দিয়ে বলে, “ভাই, জায়গা ছাড়!” ফলে মাথাব্যথা আর দৃষ্টির সমস্যা শুরু হয়। যেন প্রতিবেশী বাসায় লোক বেড়েছে আর আপনার ঘরে আলো-বাতাস কমে গেছে।

২. ফাংশনাল টিউমার (কার্যকর)

এরা হচ্ছে ‘ওভার অ্যাকটিভ’ টাইপ। অতিরিক্ত হরমোন ঢালতে থাকে। ফলে শরীরে নানা রকম ‘হরমোন পার্টি’ শুরু হয় — ওজন বেড়ে যাওয়া, ক্লান্তি, মুখের আকার বদলে যাওয়া, হাড়ের সমস্যা ইত্যাদি। শরীর যেন হঠাৎ বলছে, “একটু বেশি চালাচ্ছিস রে!”

৩. পিটুইটারি কার্সিনোমা

খুবই বিরল। এটা সত্যিকারের ক্যান্সার। তবে এতটাই কম যে, চিন্তা করার চেয়ে সচেতনতা রাখাই ভালো।


হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট হলে যেসব লক্ষণ দেখা দেয়


পিটুইটারি টিউমার অনেক সময় অতিরিক্ত হরমোন তৈরি করে বা স্বাভাবিক হরমোন উৎপাদন কমিয়ে দেয়। ফলে লক্ষণগুলো ভিন্ন ভিন্ন হয়:


প্রোল্যাকটিন বেশি হলে (প্রোল্যাকটিনোমা — সবচেয়ে কমন):

- নারীদের: অনিয়মিত মাসিক, মাসিক বন্ধ, স্তন থেকে দুধের মতো স্রাব (গ্যালাক্টোরিয়া)।

- পুরুষদের: যৌন ক্ষমতা কমে যাওয়া, বুক বড় হয়ে যাওয়া।

- উভয়ের: কামশক্তি হ্রাস, বন্ধ্যাত্ব।


গ্রোথ হরমোন বেশি হলে:

- শিশু-কিশোর: অস্বাভাবিক লম্বা হয়ে যাওয়া (জায়ান্টিজম)।

- প্রাপ্তবয়স্ক: অ্যাক্রোমেগালি — হাত-পা, চোয়াল, নাক বড় হয়ে যাওয়া, ঘাম বেশি, জয়েন্টে ব্যথা।


ACTH বেশি হলে (কুশিং ডিজিজ):

- মুখ গোলাকার (মুন ফেস), ঘাড়ে চর্বি জমা, পেটে স্ট্রেচ মার্ক, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, মেজাজ খারাপ।


থাইরয়েড হরমোন সংক্রান্ত: ওজন কমা, ঘাম, হার্টবিট বেড়ে যাওয়া।


হরমোন কম হলে (হাইপোপিটুইটারিজম):

- অবসাদ, ওজন বাড়া/কমা, শরীরের লোম পড়ে যাওয়া, ঠান্ডা লাগা, যৌন সমস্যা, নারীদের মাসিক অনিয়মিত।


কখন ডাক্তারের কাছে যাবেন?


যদি দেখেন:

- অব্যাখ্যাত মাথাব্যথা + দৃষ্টি ঝাপসা হচ্ছে,

- হঠাৎ শারীরিক পরিবর্তন (ওজন, মাসিক, যৌন ক্ষমতা),

- অস্বাভাবিক ক্লান্তি বা মেজাজের পরিবর্তন,


তাহলে দেরি না করে "এন্ডোক্রাইনোলজিস্ট" বা "নিউরোসার্জন"-এর কাছে যান। MRI করে সহজেই ধরা পড়ে।


মজার কথা: অনেক পিটুইটারি টিউমার এত ছোট থাকে যে কোনো লক্ষণই দেখা দেয় না। কিন্তু যখন দেখা দেয়, তখন শরীর বলে দেয়—“একটু খেয়াল করো তো ভাই!”


পিটুইটারি টিউমার ভয়ের কিছু নয়—আধুনিক চিকিৎসায় (ওষুধ, অস্ত্রোপচার, রেডিয়েশন) বেশিরভাগ ক্ষেত্রে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসে। তবে প্রথম দিকে ধরতে পারলে সবচেয়ে সহজ।


সতর্ক থাকুন, শরীরের সিগন্যাল অগ্রাহ্য করবেন না। সন্দেহ হলে অবশ্যই বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শ নিন। সুস্থ থাকুন, সচেতন থাকুন! 


(তথ্যসূত্র: মেডিকেল জার্নাল, মায়ো ক্লিনিক, অ্যাপোলো হসপিটালসসহ নির্ভরযোগ্য সোর্স থেকে সংগৃহীত। চিকিৎসার জন্য ডাক্তার দেখানো অত্যাবশ্যক।)

Tags:

Post a Comment

0Comments

Post a Comment (0)