থাইরয়েড টেস্ট সাধারণত একটি সাধারণ রক্ত পরীক্ষার (Blood Test) মাধ্যমে করা হয়। আপনার শরীরে থাইরয়েড হরমোনের মাত্রা ঠিক আছে কি না, তা জানার জন্য ডাক্তাররা এই পরীক্ষা দিয়ে থাকেন।
থাইরয়েড গ্রন্থি আমাদের শরীরের মেটাবলিজম, শক্তি উৎপাদন এবং সার্বিক বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ করে। তাই এই হরমোনের ভারসাম্য ঠিক আছে কি না—যেমন হাইপোথাইরয়েডিজম (হরমোনের ঘাটতি) বা হাইপারথাইরয়েডিজম (হরমোনের আধিক্য) আছে কি না—তা নিশ্চিত হওয়ার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য এবং প্রাথমিক উপায় হলো এই ব্লাড টেস্ট।
১. টেস্টে সাধারণত কী পরীক্ষা করা হয়?
ডাক্তার আপনার সমস্যার ওপর ভিত্তি করে একটি বা একাধিক টেস্ট দিতে পারেন। একে সাধারণত Thyroid Function Test (TFT) বলা হয়। এর মধ্যে প্রধান হলো:
TSH (Thyroid Stimulating Hormone): এটি মস্তিষ্কের পিটুইটারি গ্রন্থি থেকে তৈরি হয়। থাইরয়েড পরীক্ষার জন্য এটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
Free T4 (FT4) এবং Free T3 (FT3): এগুলো থাইরয়েড গ্রন্থি থেকে সরাসরি নিঃসৃত প্রধান হরমোন।
২. পরীক্ষার প্রস্তুতি (Preparation)
খালি পেটে থাকা: থাইরয়েড টেস্টের জন্য সাধারণত খালি পেটে থাকার বাধ্যবাধকতা নেই। দিনের যেকোনো সময় এই পরীক্ষা করা যায়। তবে ডাক্তার যদি এর সাথে অন্য কোনো পরীক্ষা (যেমন- লিপিড প্রোফাইল বা সুগার টেস্ট) দেন, তবে ৮-১২ ঘণ্টা খালি পেটে থাকতে হতে পারে। সাধারণত সকালের দিকে রক্ত দেওয়া সবচেয়ে ভালো।
ওষুধের বিষয়ে সতর্কতা: আপনি যদি আগে থেকেই থাইরয়েডের কোনো ওষুধ বা বায়োটিন (Biotin) যুক্ত সাপ্লিমেন্ট খেয়ে থাকেন, তবে রক্ত দেওয়ার আগে ল্যাব টেকনিশিয়ান বা ডাক্তারকে তা জানান। সাধারণত সকালের থাইরয়েডের ওষুধ রক্ত দেওয়ার পরেই খেতে বলা হয়।
৩. রক্ত নেওয়ার প্রক্রিয়া (Sample Collection)
ল্যাবের রক্ত সংগ্রহকারী (Phlebotomist) প্রথমে আপনার হাতের ভেতরের দিকের (কনুইয়ের ওপরের অংশ) একটি শিরা নির্বাচন করবেন।
এরপর জীবাণুনাশক বা অ্যান্টিসেপটিক লিকুইড দিয়ে জায়গাটি ভালোভাবে পরিষ্কার করা হবে।
একটি নতুন এবং জীবাণুমুক্ত সূক্ষ্ম সুই (Syringe) ফুটিয়ে সামান্য রক্ত একটি বিশেষ টিউবে নেওয়া হবে। সুই ফোটানোর সময় সামান্য পিঁপড়ে কামড়ানোর মতো অনুভূতি হতে পারে।
রক্ত নেওয়া শেষ হলে সুই বের করে সেখানে তুলা বা একটি ছোট ব্যান্ডেজ চেপে দেওয়া হবে, যাতে রক্তপাত বন্ধ হয়।
৪. ফলাফল (Report)
রক্ত দেওয়ার পর ল্যাবভেদে সাধারণত এক থেকে দুই দিনের মধ্যে থাইরয়েড টেস্টের রিপোর্ট পাওয়া যায়।
বাংলাদেশে থাইরয়েড টেস্টের খরচ আপনি কোন ল্যাব বা হাসপাতাল থেকে পরীক্ষাটি করাচ্ছেন এবং ডাক্তার ঠিক কোন কোন টেস্ট (যেমন শুধু TSH নাকি পুরো প্রোফাইল) দিয়েছেন, তার ওপর নির্ভর করে।
নিচে বর্তমানের একটি আনুমানিক খরচ তালিকা দেওয়া হলো:
১. টেস্টের ধরন অনুযায়ী খরচ
শুধু TSH (Thyroid Stimulating Hormone): সাধারণত ৭০০ থেকে ১,০০০ টাকা। (বেশিরভাগ সময় প্রাথমিক স্ক্রিনিংয়ের জন্য ডাক্তাররা শুধু এটিই দিয়ে থাকেন)।
FT4 (Free Thyroxine): সাধারণত ৮০০ থেকে ১,০০০ টাকা।
FT3 (Free Triiodothyronine): সাধারণত ৮০০ থেকে ১,০০০ টাকা।
থাইরয়েড প্রোফাইল (TSH, FT4, FT3 একসাথে): যদি ডাক্তার এই তিনটি টেস্ট একসাথে দেন, তবে ল্যাবভেদে মোট খরচ ২,২০০ থেকে ৩,০০০ টাকা পর্যন্ত হতে পারে।
২. বিভিন্ন ডায়াগনস্টিক সেন্টার অনুযায়ী খরচ (আনুমানিক)
পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টার (Popular Diagnostic Centre): এখানে একক টেস্টগুলো (যেমন শুধু TSH বা FT4) সাধারণত ৮০০ থেকে ১,০০০ টাকা এবং ফুল থাইরয়েড প্যানেল বা প্যাকেজ করালে ২,৪০০ টাকার আশেপাশে খরচ হতে পারে।
ইবনে সিনা (Ibn Sina): এখানেও প্রতিটির রেট সাধারণত ৮০০ টাকা করে। তবে অনেক সময় ইবনে সিনা বা অন্যান্য ল্যাবে ২০%-২৫% পর্যন্ত সান্ধ্যকালীন বা বিশেষ ছাড় (Discount) থাকলে খরচ কিছুটা কমে আসে।
থাইরোকেয়ার বা অন্যান্য কর্পোরেট ল্যাব (Thyrocare / Praava): হেলথ প্যাকেজের আওতায় করালে থাইরয়েড প্রোফাইল ১,৫০০ থেকে ২,৫০০ টাকার মধ্যে পাওয়া যায়।
সরকারি হাসপাতাল: আপনি যদি ঢাকা মেডিকেল, পিজি হাসপাতাল (BSMMU) বা যেকোনো সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে করান, তবে প্রতি টেস্টের খরচ পড়বে মাত্র ১৫০ থেকে ৩০০ টাকা।

