ছোটবেলায় কুকুর দেখলেই পা কাঁপতো, তাই না? মনে পড়ে সেই গল্প—কামড়ালেই নাভির গোড়ায় চোদ্দটা ইনজেকশন, আর জলাতঙ্ক হলে পানি পর্যন্ত খাওয়া যাবে না! ভয়ে রাস্তায় কুকুর দেখলে দৌড় দিতাম আমরা অনেকেই। আজও আমাদের দেশে হাজার হাজার মানুষ কুকুর দেখলেই অস্বস্তিতে পড়েন। কিন্তু সত্যিটা কী? "সব কুকুরের কি জলাতঙ্ক থাকে?" চলুন, হাসতে হাসতে এই ভয়টা একবার সাফ করে ফেলি।
কুকুর কেন কামড়ায়? নাকি আমরাই ডেকে আনি বিপদ?
কুকুর আসলে নিতান্ত নিরীহ প্রাণী। সে কামড়ায় মূলত যখন নিজেকে হুমকিতে ফেলে মনে করে। আর সেই ‘হুমকি’টা অনেক সময় আমরাই তৈরি করি।
- রাস্তায় কুকুর দেখলেই “হুস হুস” করে তাড়ানো
- শিশুদের ঢিল ছোড়া
- ঘেউ ঘেউ শুনলেই আতঙ্কে দৌড় দেওয়া
এসব দেখে কুকুর ভাবে—‘এই মানুষটা তো বিপজ্জনক!’ ফলে প্রতিরক্ষায় কামড়াতে পারে। অথচ শান্তভাবে হেঁটে গেলে বা একটু আদরের সুরে ডাকলে বেশিরভাগ কুকুরই লেজ নাড়িয়ে সাড়া দেয়।
সব কুকুরের কি জলাতঙ্ক থাকে? একদম না!
এটাই সবচেয়ে বড় ভুল ধারণা। জলাতঙ্ক (র্যাবিস) কোনো জন্মগত রোগ নয়। একটি কুকুরের শরীরে এই ভাইরাস আসে শুধুমাত্র জলাতঙ্কে আক্রান্ত অন্য কোনো প্রাণী (কুকুর, শিয়াল, বাদুড় ইত্যাদি) কামড়ালে।
সুস্থ, টিকা দেওয়া কুকুর কামড়ালে জলাতঙ্ক হয় না। সরকারি টিকাদান কর্মসূচি চললে তো আরও নিশ্চিন্ত। আপনার এলাকায় যদি নিয়মিত টিকা পড়ে, তাহলে রাস্তার কুকুরদের বেশিরভাগই নিরাপদ। আর যদি না পড়ে, তাহলে স্থানীয় জনপ্রতিনিধির সঙ্গে কথা বলে কর্মসূচির ব্যবস্থা করতে পারেন—এতে পুরো এলাকার ঝুঁকি অনেক কমে যায়।
কামড় লাগলে কী করবেন? (১৪টা ইনজেকশনের গল্প ভুলে যান)
ধরুন কোনো কারণে কামড় লেগেই গেল। আতঙ্কিত হবেন না। প্রথম এবং সবচেয়ে জরুরি কাজ:
১. ক্ষতস্থান সাবান দিয়ে (বিশেষ করে ক্ষারীয় সাবান) অন্তত ১৫ মিনিট ধরে ভালো করে ধোয়া।
২. যত তাড়াতাড়ি সম্ভব চিকিৎসকের কাছে যাওয়া।
আজকাল আর নাভিতে ইনজেকশন দিতে হয় না! "বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)-এর প্রোটোকল অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শে ৪টি বা নির্দিষ্ট সংখ্যক ডোজ দেওয়া হয়"। "ক্ষত গভীর হলে চিকিৎসকরা ভ্যাকসিনের পাশাপাশি ক্ষতস্থানে সরাসরি এক ধরণের বিশেষ ইনজেকশন (ইমিউনোগ্লোবুলিন) দিয়ে থাকেন।"। ব্যস, এতটুকুই।
লালা লাগলেই কি বিপদ?
আরেকটা কমন ভয়। কুকুরের লালা লাগলেই জলাতঙ্ক হয় না। শুধু জলাতঙ্ক আক্রান্ত কুকুরের লালায় ভাইরাস থাকতে পারে। আর সেটাও ত্বকে কোনো কাটাছেঁড়া না থাকলে সহজে ছড়ায় না। তাই লালা লাগলে শুধু হাত ধুয়ে নিন, প্যানিক করবেন না।
চলুন, একটু মানবিক হই
পথের কুকুরগুলো আজকাল খাবার পায় কম। ময়লার স্তূপও কমে গেছে। অথচ একটু উচ্ছিষ্ট খাবার, বিস্কুট, পানি বা বৃষ্টির দিনে একটু আশ্রয় দিলেই তাদের জীবন বদলে যায়। যে কুকুরটা আপনার কাছ থেকে ভালোবাসা পাবে, সে আপনাকে কামড়াবে না—বরং দেখলেই লেজ নাড়বে।
ধর্মীয় কারণে কেউ কেউ কুকুর পছন্দ করেন না। কিন্তু প্রায় সব ধর্মই প্রাণীদের প্রতি দয়া করতে শেখায়। গায়ে হাত না-ই বুলালেন, অন্তত ক্ষতি তো করবেন না।
"সব কুকুরের কি জলাতঙ্ক থাকে?" না, থাকে না। ভয়কে জয় করুন, জ্ঞান দিয়ে। কুকুরকে ভয় না পেয়ে সম্মান করুন। দেখবেন, রাস্তাটা অনেক সুন্দর লাগবে।
আপনার এলাকায় কুকুরদের টিকাদান কর্মসূচি চলছে কি? নিচে কমেন্ট করে জানান। ভালোবাসা আর সচেতনতা দিয়েই আমরা এই ভয়ের চক্র ভাঙতে পারি।

.png)